রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে চায়ের দোকানদার ফারুক শেখ (৪৮) হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ফারুকের আপন ছোটভাই বারেক শেখ। শনিবার রাতে গ্রেফতার হওয়ার পর সে পুলিশের কাছে হত্যাকান্ডের বিষয়ে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেয়। তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে রাতেই গ্রেফতার করা হয় ঘাতক রুবেল ও আলমকে।
পরবর্তীতে রবিবার সন্ধ্যার পর রাজবাড়ীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কনক জাহানের এজলাসে হাজির করা হলে তারা তিনজনই হত্যাকান্ডে তাদের জড়িত থাকার বিষয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। পরে আদালতের নির্দেশে তাদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এদিকে বারেক শেখ হত্যাকান্ডের ঘটনায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার জন্য তাদের চা দোকানের কর্মচারী রুবেল ও আলমকে ভাড়া করেছিল। তারা এলাকায় চিহ্নিত মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচিত।
এরা দুজন শনিবার দুপুরে নিজ ঘরে ফারুককে ধারালো ছোল/দা দিয়ে জবাই ও দুই হাত বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করে। হত্যাকান্ডের কারন হিসেবে বারেক পুলিশের কাছে তার মেজ ভাই ফারুকের ৬টি বিবাহ করে একটি স্ত্রীকেও ধরে রাখতে না পারা, জীবদ্দশায় মায়ের সাথে অসদাচরণ, ফারুকের বিশৃঙ্খলা ব্যাক্তি জীবন সহ পারিবারিক কলহকে কারন হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে অধিকতর অনুসন্ধানকালে নিহতের পরিবার ও স্হানীয় অনেকেই জানান, ইতিপূর্বে পারিবারিক একটি জমি বিক্রি করে নিজের ভাগের ৮ লাখ টাকায় সঞ্চয় পত্র কিনে সোনালী ব্যাংকে জমা রাখেন ফারুক। টাকার নমিনি করেন তার মা'কে। কিন্তু দুই বছর আগে তার মা মারা গেলে নমিনি করেন ছোট ভাই বারেক শেখকে। তখন থেকেই ওই টাকার প্রতি কু-নজর পড়ে বারেকের।
নিহত ফারুকেরা তিন ভাই। বড় ভাইয়ের নাম ফরিদ শেখ। ফরিদ ও বারেক পৈত্রিক বাড়ির বাইরে গিয়ে সরকারি কামরুল ইসলাম কলেজ গিয়ে গিয়ে বাড়ি করে বসবাস করছেন। ফারুক একাকী তাদের পৈত্রিক বাড়ি পৌর জামতলা বাজার এলাকার বাড়িতে বসবাস করেন। তথাপি তারা তিন ভাই যৌথভাবে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর ভিতর একটি চায়ের দোকান পরিচালনা করেন। দোকানের কর্মচারী রুবেল ও আলম। মাস দেড়েক আগে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফারুক তাদেরকে মারধর করে দোকান থেকে বের করে দেয়। এর সুযোগ নেয় বারেক। সে ফারুককে শায়েস্তা করতে রুবেল ও আলমের ব্রেন ওয়াশ করে এবং ফারুককে হত্যার জন্য তাদেরকে ৩০০০ টাকার বিনিময়ে রাজি করিয়ে প্রাথমিকভাবে ১৭০০ টাকা প্রদান করে। গত ২১ আগষ্ট শুক্রবার দৌলতদিয়া রেলওয়ে ষ্টেশন এলাকায় এ নিয়ে বারেক, রুবেল ও আলমের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়।
ঘাতক আলমগীর হোসেন ওরফে আলম (২৬) উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের হোসেন মন্ডল পাড়ার ওয়াজেদ সরদারের ছেলে এবং রুবেল শেখ (৩০) একই গ্রামের বাবু শেখের ছেলে।
এলাকায় তাদের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী পুলিশ হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত দুইটি রক্তাক্ত ধারালো দা এবং হত্যাকান্ডের সময় পরিহিত তাদের রক্তাক্ত জিন্স, টি শার্ট ও মাস্ক উদ্ধার করে।
২৩ আগষ্ট রবিবার বিকাল ৫ টায় রাজবাড়ী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপঃ) মোঃ শামসুল হক।
এ বিষয়ে সোমবার যুগান্তর অনলাইন ও পত্রিকায় সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়।
গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তার তিন আসামী রবিবার রাজবাড়ীর বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কনক জাহানের আদালতে ১৬৪ ধারায় হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। এর আগে ঘাতকদের দেয়া তথ্যের আলোকে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত দুইটি ধারালো দা এবং হত্যাকান্ডের সময় তাদের পরিহিত রক্তাক্ত শার্ট,প্যান্ট ও মাস্ক উদ্ধার করে জব্দ করা হয়।
এছাড়া নিহত ফারুকের বাবা খালেক শেখের দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে আমরা হত্যাকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত সঞ্চয় পত্রের টাকার প্রতি বারেকের লোভ, দুই ঘাতকের মাদক সংশ্লিষ্টতা সহ অন্যান্য বিষয়ে অধিকতর তদন্ত পরিচালনা করছি।