নাগরিক সেবার দীর্ঘসূত্রতা, নানা দপ্তরে ঘুরে বেড়ানোর ক্লান্তি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান ঘটিয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনকে সহজ ও শৃঙ্খলিত করতে এক যুগান্তকারী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ধাপে সরকারি ও বেসরকারি নানা সেবা গ্রহণের প্রচলিত জটিল প্রক্রিয়াকে চিরতরে বদলে দিতে চালু হতে যাচ্ছে সর্বজনীন ও বহুপ্রতীক্ষিত ‘এক-আইডি’ কার্ড ব্যবস্থা। নবজাতক শিশু থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আজীবন ব্যবহারের উপযোগী এই একক পরিচয়পত্রটি কেবল একটি সাধারণ প্লাস্টিক কার্ড নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশের মুকুটে যুক্ত হওয়া এক নতুন মাইলফলক। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি অনন্য ইউনিক নম্বর বা পরিচয় নিশ্চিত করা হবে, যা ভবিষ্যতে সব নাগরিক সেবাকে একটি মাত্র প্ল্যাটফর্মের সুতোয় গেঁথে ফেলবে।
প্রস্তাবিত এই অভিনব ও বহুমুখী পরিচয়পত্রটির আনুষ্ঠানিক নাম দেয়া হয়েছে ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’। বর্তমানে একজন নাগরিককে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, টিন সার্টিফিকেট, স্বাস্থ্যবিমা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতাসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজের জন্য আলাদা আলাদা কাগজ ও কার্ডের ওপর নির্ভর করতে হয়। একেক দপ্তরে গিয়ে একেক রকম তথ্যের পুনরাবৃত্তি জমা দেয়া, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এবং তথ্যের অসঙ্গতির কারণে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। শুধু তা-ই নয়, অনেক ক্ষেত্রে এই বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে নানা জালিয়াতি ও দুর্নীতির পথও উন্মুক্ত থাকে। সরকারের নতুন এই ‘এক-আইডি’ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নাগরিকরা এই বহুমুখী ভোগান্তি থেকে একযোগে মুক্তি পাবেন। ব্যক্তির জন্ম নিবন্ধনের পরপরই তাকে এই আজীবন কার্ডের আওতায় নিয়ে আসা হবে, যা পরে’ তারশিক্ষাজীবন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং লেনদেন এবং বয়স্ক ভাতা বা সামাজিক সুরক্ষার মতো প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করবে।
প্রস্তাবিত এই ডিজিটাল কার্ডটিতে অত্যাধুনিক বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং চিপ প্রযুক্তি যুক্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা নাগরিক তথ্যের গোপনীয়তা ও সুরক্ষা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিশ্চিত করবে। এর ফলে ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি বা একই ব্যক্তির নামে একাধিক আইডি কার্ড ব্যবহারের অপচেষ্টা চিরতরে বন্ধ হবে। বিশেষ করে, দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ যারা দাপ্তরিক জটিলতার কারণে অনেক সময় সরকারি বিভিন্ন প্রণোদনা বা সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন, তারা এই একক কার্ডের সুবাদে সহজেই নিজেদের অধিকার ও সেবা নিশ্চিত করতে পারবেন। স্বাস্থ্য খাতের কথা যদি ধরা হয়, তবে এই কার্ডের মাধ্যমে যেকোনো নাগরিক দেশের যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, তার সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য ইতিহাস ও চিকিৎসার রেকর্ড চিকিৎসকরা এক ক্লিকেই দেখতে পাবেন, যা জরুরি মুহূর্তে জীবন রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে চলতি ২০২৬ সাল থেকে শুরু করে আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বর্তমান প্রচলিত নিয়মে বাংলাদেশে জন্মের পর শিশুদের জন্মনিবন্ধন সনদ দেয়া হয় এবং বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ড প্রদান করা হয়। এ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট, টিন সার্টিফিকেট (টিআইএন), ফ্যামিলি কার্ড কিংবা কৃষকের কার্ডের মতো আলাদা আলাদা কাগজ ও কার্ড বহন করতে হয়। তবে নতুন এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন হলে ধীরে ধীরে বিদ্যমান অন্যান্য কার্ডগুলোর কার্যকারিতা এবং প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে আসবে।
একটিমাত্র পলিকার্বোনেট চিপ সংবলিত ডিজিটাল কার্ডের ভেতরেই একজন নাগরিকের সব তথ্য ও পরিচয়ের সমন্বয় ঘটানো হবে। ফলে আলাদা আলাদা দপ্তরে ঘুরে তথ্য প্রদানের সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ হবে এবং নাগরিক সেবা প্রাপ্তি হবে অত্যন্ত সহজ ও ঝামেলাহীন। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের বিদ্যমান ডেটাবেইসগুলোর মধ্যে কার্যকর আন্তঃসংযোগ বা ইন্টারঅপারেবিলিটি তৈরি করার মাধ্যমে এই একক পরিচয়পত্রটি কাজ করবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারির তথ্যকে ভিত্তি ধরে দেশের প্রায় ১৮ কোটি নাগরিককে এই কার্ডের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা বিবেচনা করে মোট ২০ কোটি কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি বিবরণী থেকে জানা যায়- উৎপাদন ও মুদ্রণ খরচ: প্রতিটি উন্নত মানের পলিকার্বোনেট চিপ কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণে প্রায় ২ মার্কিন ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে। বিতরণ ও সরবরাহ খরচ: প্রতিটি কার্ড সঠিকভাবে বিতরণ ও সরবরাহের জন্য ধরা হয়েছে ১ মার্কিন ডলার। প্রাথমিক হিসাব: সব মিলিয়ে প্রতিটি কার্ডের উৎপাদন, মুদ্রণ, বিতরণ ও সরবরাহ বাবদ প্রায় ৩৬৯ টাকা খরচ করা হবে। মোট প্রকল্প ব্যয়: পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এই বিশাল ব্যয়ের একটি বড় অংশ আসবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে।
এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল বা জিওবি থেকে জোগান দেয়া হবে ৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা এবং বাকি ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংকের সহজ শর্তের ঋণ থেকে অর্থায়ন করা হবে। কার্ডের সামগ্রিক ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশের অর্থ অর্থাৎ প্রায় ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা খরচ হবে কার্ড উৎপাদন, মুদ্রণ, নাগরিকদের বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ ও অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য) তথ্য সংগ্রহ এবং বিতরণ প্রক্রিয়ায়। বর্তমানে দেশের একজন সাধারণ নাগরিককে নানা প্রয়োজনে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং কর শনাক্তকরণ নম্বরের মতো ভিন্ন ভিন্ন আইডি কার্ড সঙ্গে রাখতে হয়। প্রতিটি দপ্তরে আলাদা করে ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান করতে গিয়ে নাগরিকদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদ্যমান ডেটাবেইসগুলো যেমন এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট ও টিআইএনের মধ্যে একটি সমন্বিত আন্তঃসংযোগ বা হাব তৈরি করা গেলে এই ভোগান্তি বহুলাংশে কমে আসবে। ‘এক-আইডি’ চালুর ফলে সরকারি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একটিমাত্র সেন্ট্রাল ডেটাবেইস থেকেই নাগরিকের সত্যতা যাচাই করতে পারবে, যা একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সেবার মান বৃদ্ধি করবে এবং ভুয়া বা জালিয়াতি রোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।