সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও দেশটির রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়ার একটি উড়োজাহাজে হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন পাইলটও রয়েছেন। সবাই সৌদির নাগরিক। এছাড়া আহত হয়েছেন বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকজন নাগরিক।
গত বৃহস্পতিবার জোড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর বিমানবন্দরে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। নিরাপত্তার কারণে ৩৩০টির বেশি ফ্লাইট বাতিলের খবর পাওয়া গেছে। তবে বাতিলের এ সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা হামলার দায় স্বীকার করেছে। তাদের দাবি, রিয়াদ বিমানবন্দর ছাড়াও ইয়েমেন সীমান্তবর্তী নাজরান শহরের একটি বিমানবন্দর এবং খামিস মুশাইতের একটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ হামলার জন্য দায়ীদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি বিমানবন্দরের স্থাপনায় আঘাত হানে। দ্বিতীয়টি আঘাত করে বিমানবন্দরে মাটিতে থাকা সৌদিয়ার একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজে। হামলার সময় বিমানটিতে কোনো যাত্রী ছিলেন না। আগুনে উড়োজাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জরুরি সেবাদানকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের হাসপাতালে নেয়।
ফ্লাইট চলাচলে বিপর্যয়: হামলার পর রিয়াদ বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত আগমন ও প্রস্থানের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ফ্লাইট বাতিল হয়। অনেক ফ্লাইটের সময়সূচিও পরিবর্তন করা হয়।
নিরাপত্তার উদ্বেগে ভারতের কয়েকটি বিমান সংস্থা এবং জার্মানির লুফথানসা রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত করে। সৌদি জানিয়েছে, জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে।
সৌদি-হুতি সংঘাতের শুরু: সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে বর্তমান সংঘাতের সূত্রপাত ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট ও গৃহযুদ্ধ থেকে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। পরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বুহ মানসুর হাদির সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে হাদি দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন।
হাদির সরকারকে পুনর্বহাল করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে।
এর জবাবে হুতিরা সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে হামলা চালাতে শুরু করে। ২০১৫ সালের মে মাসে ইয়েমেন থেকে সৌদি শহর নাজরানে মর্টার হামলায় তিনজন নিহত হন। এরপর সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর, বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে।
যুদ্ধবিরতির পর আবার উত্তেজনা: ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইয়েমেনে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। এতে বড় ধরনের সংঘর্ষ কিছুটা কমলেও সংকটের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হয়নি। হুতিরা ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও তাদের সমর্থক বাহিনী দেশের বিভিন্ন অংশে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালি: ইয়েমেনের সংঘাত শুধু সৌদি আরব ও দেশটির প্রতিবেশীদের নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির পশ্চিম উপকূলের কাছে বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ।
এ অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে জাহাজ চলাচল, পণ্য পরিবহন ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। একইভাবে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।