ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বছরে ১৫৪ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন

বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে ঋণ হিসেবে। ২০১০ সালের পর থেকে এই খাতে মাথাপিছু ঋণ বেড়েছে ১৩ গুণ এবং ২০৪০ সাল নাগাদ তা ১০৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই ঋণের চাপ কমাতে একটি ‘রিনিউয়েবল এনার্জি সভরেইন্টি ফ্যাসিলিটি (RESF)’ বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি সার্বভৌমত্ব তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ। প্রতিষ্ঠানটির মতে, প্রস্তাবিত এই তহবিলের মাধ্যমে ২০৪০ সালের মধ্যে মাথাপিছু ঋণ ৭৭ শতাংশ কমিয়ে ১০৫ ডলার থেকে ২৪ ডলারে নামিয়ে আনা সম্ভব।


মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা: সরকারি অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রবাহিত করা’ শীর্ষক এক জাতীয় সংলাপে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। কপ৩১ সামনে রেখে আয়োজিত এই সংলাপে সরকারি ঋণের চাপ না বাড়িয়ে কীভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।


গবেষণার তথ্য তুলে ধরে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর মোফাজ্জল হোসেন জানান, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বছরে প্রায় ১৫৪ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক সম্প্রসারণের গতি অনুযায়ী বর্তমানে বিনিয়োগ হচ্ছে মাত্র ১৯ কোটি ডলার, যা মোট চাহিদার প্রায় ১৩ শতাংশ। ফলে প্রতি বছর প্রায় ১৩৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঘাটতি থাকছে।


অনুষ্ঠানে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এম. জাকির হোসেন খান বলেন, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের জন্য সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বাণিজ্যিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী অর্থায়নের ইকোসিস্টেম তৈরির আহ্বান জানান তিনি।


সংলাপে সভাপতির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তিনি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসার ও আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দেন।


প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এমপি বলেন, আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও অতিরিক্ত ঋণের চাপ কমাতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে স্বচ্ছতা, সমন্বিত বিনিয়োগ ও জলবায়ু কূটনীতি জোরদার করা প্রয়োজন।


সম্মানীয় অতিথি সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী অর্থায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং পানি নিরাপত্তা ও কৃষকের জীবিকার মতো বিষয়গুলোকে জ্বালানি নীতির সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানান।


প্রতি ১ ডলার অনুদানের বিপরীতে ৯ ডলার ঋণ গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জলবায়ু অর্থায়নের ৯২ শতাংশই ছিল ঋণ। কয়লা ও গ্যাসের চিহ্নিত প্রকল্পগুলো বাদ দেওয়ার পরও জ্বালানি খাতে প্রতি ১ ডলার অনুদানের বিপরীতে বাংলাদেশ প্রায় ৯ ডলার ঋণ পেয়েছে, যা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গড়ের (১.৫৩ ডলার) চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি।


বিশেষ তহবিল গঠনের রূপরেখা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের মতে, ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপের অধীনে প্রস্তাবিত তহবিলটি (RESF) গঠন করা প্রয়োজন। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) এটি পরিচালনা করবে এবং পিকেএসএফ (PKSF) স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থায়নের বিষয়টি দেখভাল করবে। গবেষণায় বলা হয়, বিদ্যুৎ ও এলএনজি খাতের ভর্তুকির ৫ শতাংশ তহবিলে স্থানান্তর এবং উন্নয়ন ব্যাংকের গ্যারান্টির মাধ্যমে বিনিয়োগ ঝুঁকি কমানো সম্ভব। মডেল অনুযায়ী, ২০২৬-২০৩০ মেয়াদে ৭৬৯ কোটি ডলার বিনিয়োগ চাহিদার বিপরীতে নতুন সার্বভৌম ঋণের পরিমাণ ৪৬১ কোটি ডলার থেকে কমিয়ে ৭৭ কোটি ডলারে নামিয়ে আনা সম্ভব।


অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পিকেএসএফ-এর সাবেক ডিএমডি ড. ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগের সাবেক পরিচালক খন্দকার মোরশেদ মিল্লাত, ইসলামিক ফাইন্যান্স ও সাসটেইনেবিলিটি বিশেষজ্ঞ ড. মাহমুদ উমর ফারুক এবং শক্তি ফাউন্ডেশনের উপ-নির্বাহী পরিচালক ইমরান আহমেদ। বক্তারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত ও সাশ্রয়ী অর্থায়ন পৌঁছানো, জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলায় জাকাত ও গ্রিন সুকুকের মতো ইসলামিক অর্থায়নের যথাযথ ব্যবহার এবং সবুজ অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫-২০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব দেন।


ads
ads
ads

Our Facebook Page

↑