এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, যা চলতি বাজেটে রয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৩২৬ ডলার অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে, যা চলতি বাজেটে রয়েছে ২ হাজার ১৭৩ ডলার।
জানা যায়, চলমান করোনা সঙ্কটের মধ্যে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ ভারত ছাড়া বাংলাদেশের ধারে কাছেও আর কেউ নেই। কারণ বড় অর্থনীতির দেশগুলো তো প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে অনেক আগেই মাইনাস অবস্থায় চলে গেছে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে দেশের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৯০৯ ডলার।
চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম আট মাসের (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) তথ্য বিশ্লেষণ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)। সংস্থাটির প্রাথমিক হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন পাওয়া গেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এর ফলে জিডিপির আকার দাঁড়াবে ২৮ লাখ ৫ হাজার ১২১ কোটি টাকা। আর মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ হাজার ৯৬৮ দশমিক ৭৩ ডলার (প্রতি ডলার ৮৫.০৯ টাকা ধরে)। মাথাপিছু আয়ের এই গড় হিসাবের ক্ষেত্রে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৭৪ লাখ ধরা হয়েছে।
অবশ্য কানাডীয় গণমাধ্যম বিএনএন ব্লুমবার্গকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে পরিকল্পনামন্ত্রী আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এদেশের প্রবৃদ্ধি হতে চলেছে অন্তত ৬ থেকে ৭ শতাংশ, যা হবে করোনা সঙ্কটে বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, ‘পরিষ্কারভাবেই প্রবৃদ্ধি অনেক কম, লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক কম। আমাদের অগ্রাধিকার বুঝতে হবে। স্বাস্থ্য এখন জরুরী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে আগের চেয়েও বেশি বিনিয়োগ দরকার।’
এম এ মান্নান বলেন, ‘এই মুহূর্তে সবকিছু চালু করা প্রয়োজন। করোনাভাইরাস আমাদের মারাত্মক ক্ষতি করেছে। এটা একটা তেতো ওষুধের মতো।’ পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আগামী বাজেটে ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। কারণ স্বাস্থ্য, কৃষি, সড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে আরও বেশি অর্থ দরকার।’
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আগের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশ বলা হলেও মহামারীর কারণে তা কিছুটা কমে গেছে। এর আগের বছর দেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এখনই খুব বেশি উচ্ছ্বাসের কিছু নেই। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই পোশাকশিল্প নির্ভর। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও মন্ত্রীর মতো এতটা আশাবাদী নয়। তাদের হিসাবে ২০২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক বাংলাদেশ। দেশের অন্তত ৮০ শতাংশ রফতানি আয় আসে তৈরি পোশাক থেকে। আর বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প গত কয়েকমাস ধরে ব্যাপকহারে ক্রয়াদেশ বাতিল সঙ্কটে পড়েছে।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, ইউরোপীয় ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা গত মার্চ থেকে প্রায় ৩২০ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত করেছে। মহামারী প্রতিরোধে দুই মাসের লকডাউনে অন্যান্য শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
করোনাভাইরাসের কারণে ২০২০ সালে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলো ভুগবে বলে মনে করছে আন্তর্জান্তিক মুদ্রা ভা-ার-আইএমএফ। তাদের মতে, ২০২০ সালে এশিয়ার মধ্যে ভারতের প্রবৃদ্ধি হবে সবচেয়ে বেশি, আর সেটি হবে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। সংস্থাটির পূর্বাভাস হলো প্রায় সব দেশের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় চলে যাবে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র (মাইনাস ৫ দশমিক ৯ শতাংশ), জার্মানি (মাইনাস ৭ শতাংশ), জাপান (মাইনাস ৫ দশমিক ২ শতাংশ), যুক্তরাজ্য (মাইনাস সাড়ে ৬ শতাংশ), কানাডা (মাইনাস ৬ দশমিক ২ শতাংশ), ব্রাজিল (মাইনাস ৫ দশমিক ৩ শতাংশ) ও রাশিয়া (মাইনাস সাড়ে ৫ শতাংশ)। তবে চীনের প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে।
বড় উন্নয়ন সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ২ থেকে ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এর আগে বলেছে, করোনার কারণে বাংলাদেশের জিডিপির দশমিক ২ শতাংশ থেকে দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে। দ্য ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট মনে করে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে। অবশ্য এসব সংস্থা অর্থবছরের হিসাবে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। আর বিবিএস বলছে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, যা বিশ্বের কোন দেশ অর্জন করতে পারবে না।
বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে চলতি অর্থবছরে (নিজ নিজ দেশের) চারটি দেশের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়ে যাবে। দেশগুলো হলো- আফগানিস্তান (মাইনাস ৫ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে মাইনাস ৩ দশমিক ৮ শতাংশ), মালদ্বীপ (মাইনাস ১৩ শতাংশ থেকে মাইনাস সাড়ে ৮ শতাংশ), পাকিস্তান (মাইনাস ২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে মাইনাস ১ দশমিক ৩ শতাংশ) ও শ্রীলঙ্কা (মাইনাস ৩ শতাংশ থেকে মাইনাস দশমিক ৫ শতাংশ)। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ হতে পারে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। অন্যদিকে, নেপালে ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ভুটানে ২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। সেই হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। এটি অত্যন্ত গৌরবের বিষয়।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৮ মাসের একটা প্রাক্কলন করা হয়েছে। করোনাকালে সাড়ে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে বিরাট ব্যাপার। আমরা দেখছি সর্বক্ষেত্রে নেগেটিভ। এক্সপোর্ট নেগেটিভ ও ঋণ প্রবাহ সিঙ্গেল ডিজিটে। রেমিটেন্স প্রবাহ ২০ শতাংশ থেকে নেমে ১০ শতাংশ হয়েছে। বিনিয়োগের অবস্থা শোচনীয়। শুধু কৃষিতে বোরো ফসল ভাল হয়েছে। কৃষি খুব ভাল হলে সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার শতাংশের বেশি হয় না। এর মধ্যে মাছ, মুরগি, দুধ ও ডিমের অবস্থা ভাল না। অনেক কিছু নষ্ট হচ্ছে। তারপরও সাড়ে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি খুবই আশার বিষয়।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও এই প্রবৃদ্ধি নিয়ে আশাবাদী। তিনি বলছেন, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কোনভাবেই ৬ শতাংশের কম হবে না। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জিডিপি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, কেননা এখনই এটা বলার সময় আসেনি। বিশেষ করে অঙ্ক ধরে বলার উপযুক্ত সময় এটা নয়। আমাদের সামনে তো আট মাসের তথ্য রয়েছেই। বিশ্বব্যাংকের এই পূর্বাভাসকে আমি সময় উপযোগী বা পরিপক্ব কোনটাই মনে করি না। করোনাভাইরাসের প্রভাবে সারাবিশ্বের মতো আমাদেরও জিডিপি কমবে। তবে আমাদের এতটা কমবে না। কমপক্ষে ৬ শতাংশের ওপরে জিডিপি এ বছরও আমরা অর্জন করতে সক্ষম হব।
সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের জন্য টাকার অঙ্কে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রত্যাশিত জিডিপির পরিমাণ হচ্ছে ৩১ লাখ ৭১ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা। যেটি চলতি অর্থবছরের বাজেটে রয়েছে ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে অর্জিত হয়েছিল ২৫ লাখ ৪২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মিডিয়াম টার্ম ম্যাক্রোইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্কে বলা হয়েছে, আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে তিন লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি বাজেটে ধরা হয় তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর রাজস্বের লক্ষ্য ধরা হতে পারে তিন লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি বাজেটে রয়েছে তিন লাখ ৪০ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এছাড়া মোট বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হবে ১০ লাখ ৬১ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ লক্ষ্য রয়েছে নয় লাখ ৪৬ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আগামী অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারী বিনিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে সাত লাখ ৯২ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। যেটি চলমান বাজেটে রয়েছে ছয় লাখ ৯৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। এছাড়া সরকারী বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হতে পারে দুই লাখ ৬৮ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে এটি রয়েছে দুই লাখ ৪৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা।
আগামী অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয় ধরা হতে পারে ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। যা চলতি বাজেটে রয়েছে নয় লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্য ধরা হতে পারে ১৭ দশমিক ৬০ শতাংশ, যা চলতি বাজেটে রয়েছে ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। বেসরকারী খাতের ঋণের লক্ষ্য হতে পারে ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ, যা বর্তমানে রয়েছে ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ। ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের ক্ষেত্রে আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের সমান।
মিডিয়াম টার্ম ম্যাক্রোইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্কে আরও বলা হয়েছে, আগামী অর্থবছর রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ৪১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা চলতি অর্থবছর রয়েছে ৪৬ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। আমদানির ক্ষেত্রে ধরা হতে পারে ৫৪ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে রয়েছে ৬৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। রেমিটেন্স আয়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে ১৯ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমান অর্থবছরের লক্ষ্য রয়েছে ১৯ বিলিয়ন ডলার।
আগামী ১১ জুন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এতে অর্থনীতির অন্যান্য খাতগুলোকে সহায়তা দেয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।